দেশে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির পাশাপাশি বাড়ছে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতিও। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে আগুনে পুড়ে নষ্ট হয়েছে ২ হাজার ৩৬৯ কোটি ৫২ লাখ ৪০ হাজার টাকার সম্পদ। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ১৯ হাজার ৮৪৬টি অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতি হয়েছে ৪৫৩ কোটি ৫ লাখ টাকার বেশি।
সাম্প্রতিক কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গত ২৭ জুন রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের কাঁটাবনে একটি ১৪ তলা আবাসিক ভবনের ১২ তলায় আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ছয়টি ইউনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও দগ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর দুজনের মৃত্যু হয়।
এর আগে ১৬ জানুয়ারি ভোরে রাজধানীর উত্তরায় একটি আবাসিক ভবনে আগুনে দুই পরিবারের ছয়জন মারা যান। সর্বশেষ শনিবার ভোরে কক্সবাজারের ইনানী বিচসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। দগ্ধ হয়েছেন আরও অনেকে।
ফায়ার সার্ভিসের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে বাসাবাড়ি ও আবাসিক ভবনে। ২০২৫ সালে দেশে ২৭ হাজার ৫৯টি অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এসব ঘটনায় আনুমানিক ৫৬৯ কোটি ৯৭ লাখ ৭ হাজার টাকার সম্পদ নষ্ট হয়।
ওই বছরও সবচেয়ে বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটে বাসাবাড়ি ও আবাসিক ভবনে। এসব ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ২৬৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। প্রাণ হারান ৮৫ জন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৭ হাজার ৫৯টি অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে ৯ হাজার ৩৯২টি ঘটেছে বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে। অর্থাৎ মোট অগ্নিকাণ্ডের প্রায় ৩৬ শতাংশের পেছনে ছিল বৈদ্যুতিক গোলযোগ বা শর্টসার্কিট।
এর আগের বছর, ২০২৪ সালে ২৬ হাজার ৬৫৯টি অগ্নিকাণ্ডে আর্থিক ক্ষতি হয় ৪৪৬ কোটি ২৮ লাখ ৩ হাজার টাকা। ২০২৩ সালে ২৭ হাজার ৬২৪টি অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৭৯২ কোটি ৩৬ লাখ ৮২ হাজার টাকা।
অগ্নিনিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সচেতনতার অভাব ও নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সামগ্রীর ব্যবহার ভয়াবহ দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এতে প্রাণহানির পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবু নাঈম মো. শাহিদউল্লাহ যুগান্তরকে বলেছেন, দেশে উন্নয়ন ও শিল্পকারখানার সংখ্যা বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে বিদ্যুৎ ও রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার। এতে দাহ্যবস্তুর পরিমাণও বাড়ছে। কিন্তু সেই অনুপাতে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেছেন, আগুনে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি ভবন ও প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। বাড়াতে হবে প্রথম সাড়াদানকারীদের সক্ষমতাও।
তার ভাষ্য, কোথাও আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে অন্তত ১০ থেকে ১৫ মিনিট লাগতে পারে। এই সময়টুকু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগুন লাগার পরপরই তা নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেড়ে যায়।
এ কারণে ভবনের বাসিন্দা ও প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের অগ্নিনিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। আগুন লাগার শুরুতেই তাঁরা যেন প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ব্যবহার করে আগুনের বিস্তার ঠেকাতে পারেন, সেই সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। এতে ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানোর আগেই আগুনের তীব্রতা কমানো সম্ভব হবে।
সাবেক এই মহাপরিচালক আরও বলেছেন, অগ্নিনিরাপত্তা অবহেলার ক্ষেত্রে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
অগ্নিকাণ্ডের সময়কাল নিয়েও সতর্ক করেছেন আবু নাঈম মো. শাহিদউল্লাহ। তাঁর মতে, অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে আগুন লাগার ঘটনা বাড়ে। এ সময় তীব্র গরম ও শুষ্ক পরিবেশে সামান্য স্ফুলিঙ্গ থেকেও আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে। সিগারেটের আগুন থেকেও দুর্ঘটনা ঘটার ঝুঁকি থাকে। শীতকালে হিটার ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ায় অগ্নিকাণ্ডের আশঙ্কাও বাড়ে।
আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি করে—এমন অভিযোগ রয়েছে ভুক্তভোগীদের। তাঁদের অভিযোগ, উদ্ধারকারী দল পৌঁছানোর আগেই অনেক সময় সব পুড়ে শেষ হয়ে যায়।
তবে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, আগুন লাগার পর প্রথম সাড়া দেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বাসা বা প্রতিষ্ঠানের লোকজনেরও। তাঁদের প্রশিক্ষণ ও পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম না থাকলে ক্ষয়ক্ষতি কমানো কঠিন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসান যুগান্তরকে বলেছেন, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোড ও অগ্নিনিরাপত্তার নিয়ম মানার বিষয়টি অনেক সময় কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয় না।
ফায়ার সার্ভিসের ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি হওয়ার অভিযোগের জবাবে তিনি বলেছেন, আগুনের খবর পাওয়ার ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে স্টেশন থেকে বের হওয়া তাদের স্বাভাবিক নিয়ম। এ নিয়ম যথাযথভাবে পালনের চেষ্টা করা হয়। এর রেকর্ডও স্টেশনে সংরক্ষিত থাকে।
এ জাতীয় আরো খবর..